ছোটদের জন্য লেখা বা ছবিতে ছোটদেরই কেন্দ্রীয় চরিত্র করতে হবে, এমন প্রচলিত ধারণার নটেগাছ প্রথমেই মুড়িয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়৷ শিশু ও কিশোরদের জন্য তাঁর অধিকাংশ লেখায় গরহাজির ছোটরা৷ ছবির ক্ষেত্রে ‘হীরক রাজার দেশে’-তে তাও পাঠশালার ছাত্ররা আছে, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ তো শিশুরহিত ৷ বরং ‘পথের পাঁচালী, ‘অপরাজিত, ‘পরশপাথর, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা, ‘পিকু-র মতো তথাকথিত বড়দের ছবিতে অনায়াস দক্ষতায় তিনি এনেছেন ছোটদের৷
কয়েকটি ছাড়া তাঁর বাকি সব ছোটগল্পেও চরিত্র হিসেবে অনুপস্থিত খুদেরা৷ প্রাপ্তবয়স্কদের দিয়েই দিব্যি কৈশোরের কিশলয় বুনে নিয়েছেন তিনি৷ ব্যতিক্রম নয় ফেলুদার অভিযানও৷ তোপসে ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক চরিত্র প্রথম এসেছে ফেলুদার চতুর্থ প্রকাশিত অভিযান ‘শেয়াল দেবতা রহ্স্য-এ৷ তাও সেখানে শিশুচরিত্রটিকে ছাপিয়ে গিয়েছে খর্বকায় প্রাপ্তবয়স্ক বামনের উপস্থিতি৷ এর পর গ্যাংটক পেরিয়ে শিশু চরিত্র আবার এল ‘সোনার কেল্লা-য়৷ এখানে জাতিস্মর মুকুল ধরকে রাজস্থান থেকে নিরাপদে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব ছিল প্রদোষচন্দ্র মিত্রর উপর৷ এই গল্পের ছায়া ফের অনেক বছর পর ধরা পড়ে ‘নয়ন রহস্য-এ৷ সেখানেও গল্পের পরত পাক খাচ্ছে বিস্ময় ক্ষমতাসম্পন্ন বালক নয়ন তথা জ্যোতিষ্ককে ঘিরে৷ যাকে সুরক্ষিত রাখতে ফেলুদা-তোপসের পাড়ি আজকের চেন্নাই, তখনকার মাদ্রাজে৷ ‘সোনার কেল্লা-র খোঁজে গিয়ে পাওয়া লালমোহন গাঙ্গুলি তত বছরে তাঁদের বিশ্বস্ত সঙ্গী, পোড় খাওয়া অভিযাত্রিক৷
নিষ্পাপ সারল্য ছাড়া শিশুকিশোরদের অন্য কোনও বিশেষ ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন না সত্যজিৎ৷ ‘সোনার কেল্লা, ‘নয়ন রহস্য গল্প দুটি সে কথাই প্রমাণ করে৷ পূর্বজন্মের স্মৃতি মুকুলকে ছেড়ে এবং সংখ্যার নাচানাচি নয়নকে ফেলে ভ্যানিশ হয়ে যায়৷ দু’জনেই আবার ফিরে যায় স্বাভাবিক জীবনে৷
তবে বইয়ের পাতায় যেরকমই লিখুন না কেন, ছবি করার সময় কিন্তু সত্যজিৎ ফেলুদার এমন দুটি অভিযান বাছলেন, যেখানে গল্পের ভরকেন্দ্র দুই বালক৷ সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ভাষা সব সময়েই আলাদা, এ কথা বার বার বলেছেন সত্যজিৎ৷ তাই নিজেরই কলমকারিকে ভেঙে, চুরে নতুন করে পাল্টে নিলেন ছবির জন্য৷ সেই পরিবর্তনের অন্যতম হল আর এক মুকুলের আগমন ও সুরজের নিষ্ক্রমণ৷ ‘সোনার কেল্লা’-য় অন্য যে শিশুকে (গল্পে সে নীলু, ছবিতে দ্বিতীয় মুকুল) ভুলক্রমে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাকে গল্পের তুলনায় আরও বেশি জায়গা দিয়ে ছবিতে আনতে কোনও ‘মিসটেক করেননি বরেণ্য পরিচালক৷ আবার মগনলালপুত্র সুরজ মেঘরাজকে তিনি সুনিপুণভাবে বাদ দিয়েছেন ‘জয় বাবা ফেলুনাথ-এর সেলুলেয়ড রূপে৷ রুক্মিণীকুমারের সঙ্গে বন্ধু সুরজের ঘুড়িতে ঘুড়িতে খবর আদানপ্রদান তিনি বড় পর্দায় দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেননি৷ হয়তো চাননি, ছোটরা এবং তাদের অভিভাবকরা বড় পর্দায় দেখুন সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তার বাবার দুষ্কর্মের সহায়ক হয়ে উঠছে৷ তাই অপুর কৈশোরসঙ্গী লীলা এবং রুকুর বন্ধু সুরজ, দু’জনেই বাদ কাশীর আবহে৷
রুকুর মুখে ‘আফ্রিকার রাজার কাছে গণেশ এবং মুকুলের ‘দু্ষ্টু লোকের ভ্যানিশ ছিল সন্ধ্যাশশী বন্ধুর সূক্ষ্মসালসন্ধানের অন্যতম ‘ক্লু’৷ সেরকমই সমাধানের চাবিকাঠি মিস্টার মিটার পেয়েছিলেন ছোট্ট সাধনের কাছ থেকেও, ‘সমাদ্দারের চাবি গল্পে৷ এই খুদেগুলোকে ছাড়া দুর্ধর্ষ দুশমনকে ঘায়েল করতে ফেলুর অনুসন্ধিৎসাও অসম্পূর্ণ৷
সত্যজিৎ রায় একাধিক জায়গায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি ছোটদের সব সময় বড়দের মতোই দেখতেন এবং ভাবতেনও৷ তাই ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ-এ বিবি অতটুকু মেয়ে হয়েও দুঁদে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরকে সঠিক পথের চাবিকাঠি দেয়৷ বিবির কাছে ফেলুদা শুনেছিল তার দাদু মহেশ চৌধুরী নাতনিকে বলেছিলেন তিনি ‘‘কি খুঁজছেন, কী পাচ্ছেন না৷ বিবির মুখে এই কথা এবং তার হাতে পুতুলের ‘ভুরু প্লাক করার টুইজার ফেলুদাকে অমূল্য স্ট্যাম্প অ্যালবামের হদিশ পেতে সাহায্য করেছিল৷
সত্যজিৎ নিজে তাঁর যশস্বী বাবার স্নেহসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন জীবনের ভোরেই৷ পাননি বরেণ্য ঠাকুরদার সান্নিধ্যও৷ তাই হয়তো এত ভালবেসে দেখিয়েছিলেন দাদুর সঙ্গে নাতি নাতনিদের সখ্য৷ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ-এ ক্যাপ্টেন স্পার্কের প্রকৃত সহকারী ক্ষুদিরাম রক্ষিত (Raxit) তাঁর রাশভারী ঠাকুরদাই৷ আদরের নাতনি বিবির সঙ্গেই ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপগল্পে কথার খেলা খেলতেন অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী মহেশ চৌধুরী ৷ বিবি হয়ে গিয়েছিল তার ‘জোড়া মৌমাছি এবং তিনি ছিলেন নাতনির ‘জোড়া কাটারি ৷ ‘বোসপুকুরে খুনখারাপি গল্পে যাত্রাপালার বেহালাবাদক ইন্দ্রনারায়ণ আচার্যের খুব ভাব ছিল তাঁর ভাইঝি লীনার সঙ্গে৷ শুধু পরিবারের ভিতরেই নয় ৷ রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, অভিভাবকত্বের বাইরে বড়দের সঙ্গে ছোটদের বন্ধুত্বে বাধা নেই ৷ তাই প্রতিবেশী প্রৌঢ় রাধারমণ সমাদ্দারের কাছে দিনের অনেকটা সময় কাটত ছোট্ট সাধনের, ‘সমাদ্দারের চাবি গল্পে ৷
প্রৌঢ়ত্ব ও শৈশবের বন্ধুত্বে দু’জনেই যে দু’জনের সান্নিধ্যে সমৃদ্ধ হয়, সে ছবিই উঠে এসেছে সত্যজিতের কলমে ৷ তবে প্রাচীন শাস্ত্রবচনের মতোই সুকুমারপুত্রের সাহিত্যও নারীবিবর্জিত ৷ তাঁর ছবিতে নায়িকারা, নারীচরিত্ররা বহু ধারায় বিকশিত হলেও তিনি সচেতন ভাবেই সাহিত্যে কার্যত এড়িয়ে গিয়েছেন স্ত্রীচরিত্র ৷ সে কথা নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি৷ ফেলুকে তিনি রেখে দিয়েছেন শিশু কিশোরদের দাদা হিসেবেই ৷ তাই ২১, রজনী সেন রোডের বাসিন্দাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে পূর্বজন্মের গুপ্তধন, মূল্যবান পাথর, মিশরীয় মূর্তি, অওরঙ্গজেবের আংটি, শকুন্তলা পার্সিভ্যালের কণ্ঠহার, ওয়ার্ক অব আর্ট গণেশের মূর্তি বা নেপোলিয়নের লেখা চিঠিদের ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যগুলির জট ছাড়ানো নিয়েই৷ ক্ষুরধার মগজাস্ত্র সত্ত্বেও তিনি সত্যের অন্বেষণ করেননি৷ পুলিশের সমান্তরালে ইনভেস্টিগেশনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেই অমূল্য করে গিয়েছেন কয়েক প্রজন্মের কৈশোরকে ৷
এত শত চৌহদ্দি মেনে চলতে গিয়ে ফেলুদার অভিযানে শুধুই বালকের উপস্থিতি৷ বালিকারাও সেখানে কার্যত ব্রাত্য৷ এই অনুযোগ, অভিযোগের কথা শুনেছিলেন সত্যজিৎ৷ তাই হয়তো তিনি ফেলুদাকেও মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন এক কিশোরীর অনুযোগের৷ ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য-এ অম্বর সেনের ভাইঝি রুনা অভিযোগ করেছিল তোপসে একবার ফেলুদাকে তার মাসতুতো ভাই বলে উল্লেখ করেছিল৷ তাকে আশ্বস্ত করে ফেলুদার উত্তর, সে আসলে তোপসের জ্যাঠতুতো দাদা-ই৷ তোপসে প্রথমে গল্পের মতো করে লিখতে গিয়েছিল তো, তাই বইয়ে ‘মাসতুতো দাদা হয়ে গিয়েছিল৷ সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টার এই ত্রুটিস্বীকার তাঁর ঔদার্যেরই স্মারক৷
লেখার সময়পর্বে সত্যজিৎ তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের বয়স বাড়াননি ঠিকই ৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেলুদা সংবর্ধনা পেয়েছে, অটোগ্রাফ দিয়েছে, এমনকী, খুদে ভক্তদের আব্দারও সামলাতে হয়েছে৷ নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে গিয়ে দেখা হওয়া খুদে ভক্ত অনিরুদ্ধ হালদার তার স্বপ্নের গোয়েন্দা ফেলুদাকে নিয়ে গিয়েছিল ‘নেপোলিয়নের চিঠি’-র রহস্যের জট উদ্ধার করতে৷ আর, ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য’-এ রুনা তো ভেবেই আকুল! তার জেঠু যে ইচ্ছে করে লুকিয়ে আছেন প্রদোষচন্দ্র মিত্রের মগজাস্ত্রের ধার পরীক্ষা করতে, সেটা ফেলুদা ধরতে পারবে তো? না হলে তো রুনার আর মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না! থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অভিযানে মেয়েদের উপস্থিতি সাকুল্যে হলেও পাঠিকাদের কাছে ফেলুদার জনপ্রিয়তায় যে চড়া পড়েনি, সেটাই ‘রুনা’চরিত্রের মধ্যে দেখাতে চেয়েছেন সত্যজিৎ৷ তবে সত্যজিতের কল্পনায় বালিকারা কিন্তু অপরিচিত ডক্টর হাজরার সঙ্গে সোনার কেল্লার সন্ধানে রাজপুতানায় বা জাদুকরের সঙ্গে বিশেষ ক্ষমতা প্রদর্শন করতে দাক্ষিণাত্যে পাড়ি দেয় না৷ তারা বাড়ির নিশ্চিত ঘেরাটোপে থেকেই ফেলুদার তদন্ত দেখে৷
তাদের সঙ্গে আমরাও দেখি ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ুকে৷ যত দিন সেই দেখায় আনন্দ থাকে, তত দিনই আমাদের মনের জানালা খোলা থাকে৷ তার পর জানালা বন্ধ৷ কল্পনারও খেল খতম!
Liked our work ?